২০২৬ সালের আকাশ যখন বিজয়ের আবিরে রাঙা, তখন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জয়গান গাইলে এই জনপদের প্রতি অবিচার করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নম্বর খাগড়াছড়ি আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ওয়াদুদ ভূঁঞার এই বেসরকারি বিজয় আসলে কোনো আকস্মিক চমক নয়; বরং এটি দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আর পাহাড়ের তল্লাটে জমে থাকা পাহাড়প্রমাণ প্রত্যাশার এক সম্মিলিত বিস্ফোরণ। খাগড়াছড়ির রাজপথ থেকে শুরু করে পাহাডেরর চূড়া পর্যন্ত আজ যে উল্লাস, তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ব্যাকুলতা। একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি যখন এই জয়কে দেখি, তখন আমার চোখে কেবল ভোটের ব্যবধান ভাসে না, বরং ভাসে এক স্থবির হয়ে পড়া জনপদের চাকা সচল করার চ্যালেঞ্জ। ওয়াদুদ ভূঁঞা খাগড়াছড়ির রাজনীতিতে কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান যিনি অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, মানুষ আজ সেই সোনালি দিনগুলোর স্মৃতিতে ভর করেই তাকে আবার সিংহাসনে বসিয়েছে। তাকে অভিনন্দন জানানোর ভাষাটি হওয়া উচিত গুরুগম্ভীর, কারণ যে মুকুটটি আজ তার মাথায় উঠেছে, তার প্রতিটি কাঁটা হলো সাধারণ মানুষের অভাব আর দীর্ঘশ্বাস।
খাগড়াছড়ির বর্তমান অর্থনৈতিক চালচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষার্ধ পর্যন্ত এই অঞ্চলে মুদ্রাস্ফীতির হার জাতীয় গড়কে ছাড়িয়ে প্রায় ৯.২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর কর্মসংস্থানের অভাবে পাহাড়ের তরুণ সমাজ যখন এক ধরনের দিশেহারা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওয়াদুদ ভূঁঞার এই বিজয় তাদের মনে নতুন করে আশার সলতে জ্বালিয়েছে। পাহাড়ের অর্থনীতি মূলত কৃষি ও পর্যটন নির্ভর। গত কয়েক বছরে এই জনপদের পর্যটনে যে জোয়ার এসেছিল, তার সুফল সাধারণ মানুষের পকেটে কতটা পৌঁছেছে তা নিয়ে বড় ধরণের তর্কের অবকাশ আছে। আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞার কাছে খাগড়াছড়িবাসী এখন এমন এক সুষম উন্নয়ন চায়, যেখানে কেবল বড় বড় রিসোর্ট মালিকরা লাভবান হবে না, বরং একজন কৃষক কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রান্তিক উদ্যোক্তাও তার পণ্যের সঠিক মূল্য পাবে। পাহাড়ি ফলমূল, বিশেষ করে আনারস, কমলা আর কলার যে বিশাল বাজার ঢাকার কারওয়ান বাজারে বিস্তৃত, তার জন্য একটি শক্তিশালী কোল্ড স্টোরেজ চেইন আর মধ্যস্বত্বভোগীহীন বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
আর একটা কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, খাগড়াছড়ির রামগড় স্থলবন্দর এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক বিশাল অর্থনৈতিক করিডোর হওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মৈত্রী সেতু দিয়ে ভারতের ত্রিপুরার সাথে যে বাণিজ্যিক যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ সুবিধা নিতে হলে খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনিবার্য। আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই জনপদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছেন। তিনি জানেন, রামগড় স্থলবন্দরকে কার্যকর করতে পারলে খাগড়াছড়ি কেবল একটি পার্বত্য জেলাই থাকবে না, বরং এটি হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম বড় একটি বাণিজ্যিক হাব। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ভোটাররা যখন তাকে বেছে নিয়েছেন, তারা আসলে এই বাণিজ্যিক বিপ্লবের কারিগর হিসেবেই তাকে দেখতে চেয়েছেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, মানুষ এখন আর সস্তা স্লোগান চায় না, তারা চায় প্লেটে খাবার আর পকেটে টাকা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক হিসেবে আমি যখন এই জনপদের দিকে তাকাই, তখন আমার মনে পড়ে তারেক রহমান ঘোষিত সেই ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতিরাষ্ট্রের দর্শনের কথা। ওয়াদুদ ভূঁঞা এই দর্শনের অন্যতম এক পরীক্ষিত সিপাহসালার। পাহাড়ের ভৌগোলিক ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে যারা অতীতে বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, আজকের এই ফল তাদের গালে এক সজোর চপেটাঘাত। খাগড়াছড়িতে বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে যে সামাজিক পুঁজি বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারে ওয়াদুদ ভূঁঞার প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা এখন অপরিহার্য। পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। তিনি অতীতে যেভাবে উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি দুর্গম এলাকায় রাস্তাঘাট আর বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলেন, মানুষ এখন তার কাছে সেই সমবন্টনের নিশ্চয়তা চায়। খাগড়াছড়িবাসী চায় এমন এক প্রশাসন যেখানে জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক অধিকার বড় হয়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সুশাসনের যে সম্পর্ক, তা খাগড়াছড়ির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে চাঁদাবাজি আর অদৃশ্য শক্তির প্রভাবের কারণে অনেক উদ্যোক্তা পিছু হটেছেন। বেসরকারি বিনিয়োগ বা এফডিআই আকৃষ্ট করতে হলে সবার আগে এই ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে হবে। পাহাড়ের পর্যটন শিল্পকে যদি আমরা মালদ্বীপ কিংবা নেপালের আদলে সাজাতে চাই, তবে সবার আগে দরকার নিরাপত্তার গ্যারান্টি। খাগড়াছড়ির মাটি অত্যন্ত উর্বর, এখানে মসলা জাতীয় পণ্যের চাষ করে আমরা বছরে কয়েকশ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারি। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি আর ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা। আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞা যেহেতু মাটির কাছাকাছি মানুষ, তাই তার কাছে পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা হলো—তিনি যেন কেবল বড় বড় দালান তৈরি না করে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে খাগড়াছড়ির চিত্রটি এখনও বেশ করুণ। যদিও গত কয়েক বছরে কিছু অবকাঠামো হয়েছে, কিন্তু মানসম্মত সেবার অভাবে মানুষকে সামান্য সর্দিকাশিতেও চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা দৌড়াতে হয়। ২০২৬ সালের এই নতুন বাস্তবতায় খাগড়াছড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতাল আর কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অধিকার। আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞা যে পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছেন, তার মূল সুর হওয়া উচিত মানবিক উন্নয়ন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে খাগড়াছড়ির তরুণরা কেন কেবল ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য ইন্টারনেটের গতির সাথে যুদ্ধ করবে? কেন প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আইটি পার্ক থাকবে না? এই প্রশ্নগুলোই আজ ভোটাররা তাদের ব্যালটের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
খাগড়াছড়ির ভূমি সমস্যা নিয়ে যারা কথা বলেন, তারা জানেন এটি কতটা জটিল এক গোলকধাঁধা। আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি কার্যকর ও সর্বজনগ্রাহ্য ভূমিকা পালন করা। রেইনবো নেশনের যে ধারণা বিএনপি প্রধান তুলে ধরেছেন, তার সার্থকতা নির্ভর করবে পাহাড়ের ভূমি সমস্যা সমাধানে দলটির আন্তরিকতার ওপর। মানুষ আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞাকে ভোট দিয়েছে কারণ তারা বিশ্বাস করে, তিনি এই মাটির সন্তান এবং তিনি পাহাড়ের জটিল সমীকরণগুলো বোঝেন। খাগড়াছড়িবাসী চায় না আর কোনো উচ্ছেদ কিংবা কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত। তারা চায় একটি আইনি কাঠামো, যেখানে তাদের ভিটেমাটির অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। একজন কলামিস্ট হিসেবে আমি বলব, ক্ষমতার এই নতুন পর্যায়ে তাকে অনেক বেশি ধৈর্যশীল আর অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের যে টানাপোড়েন আমরা ২০২৪-২৫ সালে দেখেছি, তার হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতেই হবে। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে উৎপাদিত কফি আর কাজুবাদাম এখন বিশ্ববাজারে আমাদের নতুন পরিচয় হতে পারে। এই খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটানোই হবে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞার প্রধান অর্থনৈতিক এজেন্ডা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও কারুশিল্পকে যদি আমরা ই-কমার্সের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারি, তবে খাগড়াছড়ি হবে দেশের অর্থনীতির নতুন এক পাওয়ার হাউজ। তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে মানুষ যে রায় দিয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঞাকে একজন রাজনীতিকের গণ্ডি পেরিয়ে একজন উন্নয়ন স্থপতি হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে।
লেখাটি শেষ করতে চাই একটি গভীর উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। খাগড়াছড়ির ভোটাররা ওয়াদুদ ভূঁঞাকে যে ভালোবাসা আর সমর্থন দিয়েছেন, তা আসলে এক ধরণের ঋণ। আর এই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয় নিরবচ্ছিন্ন সেবা আর ত্যাগের মাধ্যমে। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক বিজয় যেন পাহাড়ের ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা করে, যেখানে বিভেদ নয় বরং সমৃদ্ধি হবে সবার নিত্যসঙ্গী। মানুষ আপনাকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে আসলে এক মুঠো সোনালি স্বপ্নের বীজ আপনার হাতে তুলে দিয়েছে, এখন আপনার কাজ হলো সেই বীজ থেকে এক বিশাল মহীরুহ তৈরি করা।
লেখক : মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

