আজকের ভোরের আকাশটা হয়তো অন্যদিনের মতোই ফর্সা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে যে বিশাল এক শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ হওয়ার নয়। মঙ্গলবার ঠিক ভোর ছয়টা। যখন রাজধানী ঢাকা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে, ঠিক তখনই এভারকেয়ার হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ কক্ষটি থেকে খবর এল যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশ নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। আশি বছরের এক দীর্ঘ পথচলা, যার অনেকটা জুড়েই ছিল লড়াই, দাপট আর অসীম ধৈর্য, তার সমাপ্তি ঘটল সেখানেই। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সময় তার পাশে ছিলেন বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান আর নাতনি জাইমা রহমান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং ভাই শামীম এসকান্দারসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও এই শেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চোখের কোণে জল আর প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদারের শোকাতুর কণ্ঠই বলে দিচ্ছিল, একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায় সত্যিই আজ মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।
আসলে দেশ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই চলে যাওয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদের প্রস্থান নয়, এটি একটি মহা কাব্যের সমাপ্তি। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম নাম খালেদা খানম পুতুল। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের জলপাইগুড়িতে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ভাইয়েরা সবার ছোট। তার পিতামহ হাজী সালামত আলী, মাতামহ জলপাইগুড়ির তোয়াবুর রহমান। তার বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। পরবর্তীতে তারা চলে আসেন দিনাজপুরের মুদিপাড়ায়। আদি পৈতৃকনিবাস অধুনা বাংলাদেশের ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী। বাবা জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ইস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ি যান। বোনের বাসায় থেকে মেট্রিক পাস করেন ও পরে চা ব্যবসায়ে জড়িত হন। ১৯৩৭ সালে জলপাইগুড়িতে বিয়ে করেন। জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেন এবং ১৯৮৪ সালের ১৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন একান্তভাবে একজন গৃহিণী। তিনি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেই থাকতেন। খালেদা পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুরের মিশন স্কুলে ভর্তি হন এরপর তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৬০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে।এরপর থেকে তিনি খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি স্বামীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তান এ বসবাসের পূর্বে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভকালে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি সন্ধ্যার দিকে লঞ্চে করে নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছান। তার সঙ্গে সেই সময় তার দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো এবং কর্নেল মাহফুজের স্ত্রী ছিল। সেখান থেকে তার বড় বোন খুরশীদ জাহান এবং বোনের স্বামী মোজাম্মেল হক তাদের একটি জিপে করে ঢাকার খিলগাঁওয়ে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান। খালেদা জিয়ার আসার এই খবরটি গোয়েন্দা মাধ্যমে ১০ দিনের মাথায় ছড়িয়ে পড়ে। ২৬ মে তাঁর ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হক জানতে পারেন যে পাকিস্তানি সেনারা খালেদা জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জেনে গেছে। এর পর থেকেই খালেদা জিয়ার আত্মগোপন শুরু হয়। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরতে হয় তাকে। অনেকেই নিপীড়নের ভয়ে তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয় নি। ২৮ মে মোজাম্মেল হক খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই ছেলে পিনু ও কোকোকে অন্য একটি জায়গায় সরিয়ে নেন, পরবর্তীতে ৩ জুন আবার অন্য জায়গায় সরিয়ে নেন। এরপর এক অজানা ঠিকানায় খালেদা জিয়া ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এস কে আবদুল্লাহর সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তিনি ২ জুলাই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত থাকেন।
ঘরোয়া জীবনে অভ্যস্ত একজন সাধারণ নারী থেকে রাজনীতির মাঠ কাঁপানো নেত্রী হয়ে ওঠার এই গল্পটা বড়ই চমকপ্রদ। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়া, স্বাধীনতার পর স্বামীর হাত ধরে রাজনীতির খুব কাছ থেকে দেখা, সব মিলিয়ে তার প্রস্তুতিটা হয়তো অবচেতনভাবেই চলছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের আহ্বানে তিনি ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। বেগম জিয়া এর বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
গৃহবধূর শান্ত জীবন ছেড়ে তিনি যখন দলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব নিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এই ‘ভদ্রমহিলা’ হয়তো রাজনীতির এই রুক্ষ তপ্ত জমিনে টিকতে পারবেন না। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তিনি রাজপথে নামলেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার সেই আপসহীন অবস্থান তাকে মানুষের মনে এক অনন্য জায়গা করে দিল। শতবার জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়েও তিনি মাথানত করেননি। আর সেই কারণেই দেশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন ‘আপসহীন নেত্রী’। সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের যে জোয়ার তিনি তুলেছিলেন, তারই ফসল ছিল ১৯৯১ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন। ওই নির্বাচনে তিনি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সেই কঠিন কাজটা তিনি বেশ সাহসের সাথেই করেছিলেন।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়া হয়। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সেই বিছানা থেকে তিনি হয়তো দেখছিলেন কীভাবে সময় তার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস কী ছিল না তার শরীরে? কিডনি আর হার্টের সমস্যা তো ছিল নিত্যসঙ্গী। বিদেশে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠেছিল বহুবার, কিন্তু আইনি জটিলতা আর শারীরিক অবস্থার অবনতি বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর যখন তাকে শেষবারের মতো হাসপাতালে নেওয়া হলো, তখনই যেন বাতাসটা একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসকেরা জানপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর চীনের বড় বড় বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মের কাছে সবাইকেই তো হার মানতে হয়। আশি বছর বয়সে এসে তিনি আজ সব মায়ার বাঁধন কাটিয়ে চলে গেলেন।
খালেদা জিয়ার জীবন মানেই একটা বড় লড়াইয়ের ক্যানভাস। কখনো তিনি গৃহবধূ, কখনো বন্দি স্ত্রী, কখনো রাজপথের লড়াকু সৈনিক, আবার কখনো দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে দলটিকে মানুষ মৃত ভেবেছিল, সেই বিএনপিকে তিনি আগলে রেখেছিলেন চার দশক ধরে।তার অদম্য মনোবলের কথা বিরোধীরাও একবাক্যে স্বীকার করেন।
২০১১ সালের ২৪ শে মে নিউ জার্সি স্টেট সিনেটে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ’ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ পদক প্রদান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট সিনেট কর্তৃক কোন বিদেশিকে এ ধরনের সম্মান প্রদানের ঘটনা এটাই ছিল প্রথম। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন।
এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় আজ যে শূন্যতার দীর্ঘশ্বাস বইছে, তা থামবে না সহসা। বিএনপি সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আশার বাতিঘর, আর সাধারণ মানুষের কাছে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বাহক। আজ যখন তার মরদেহের পাশে তার পরিবার আর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীরা দাঁড়িয়ে আছেন, তখন হয়তো তারা মনে মনে স্মরণ করছেন সেই নব্বইয়ের দশকের দিনগুলোর কথা, যখন তার একটি ডাকে রাজপথ প্রকম্পিত হতো। রাজনীতিতে হার-জিত থাকেই, কিন্তু ব্যক্তিত্বের যে ছাপ তিনি রেখে গেলেন, তা মুছে ফেলা অসম্ভব।
খালেদা জিয়া চলে গেলেন এমন এক সময়ে, যখন দেশ এক গভীর ক্রান্তিকাল পার করছে। তার এই প্রস্থান বিএনপির রাজনীতির জন্য এক বিরাট ধাক্কা। তারেক রহমান হয়তো এখন দলের হাল পুরোপুরি ধরবেন, কিন্তু সেই মা সুলভ ছায়া আর দলের কর্মীদের সাথে খালেদা জিয়ার যে আত্মিক টান ছিল, তা কি অন্য কেউ পূরণ করতে পারবে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। মানুষ মরণশীল, কিন্তু কিছু মানুষের কাজ আর ব্যক্তিত্ব তাদের অমর করে রাখে। খালেদা জিয়াও তেমনি একজন। ইতিহাসের পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন তার আপসহীন মনোভাব আর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
পরিশেষে একটা কথাই বলা যায়, কোনো মানুষের জীবনই ত্রুটিমুক্ত নয়, আবার কারো জীবনই কেবল সফলতার চাদরে ঢাকা নয়। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ এই রাজনৈতিক পথচলায় প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব কষবে ইতিহাসবিদরা। তবে আজকের এই দিনে সব হিসাব-নিকাশ দূরে সরিয়ে রেখে কেবল একজন প্রভাবশালী জননেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই হোক আমাদের কাজ। বিদায় বেগম খালেদা জিয়া, আপনার এই মহাপ্রয়াণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের নাম হয়ে থাকবে। এই শোক কাটিয়ে ওঠা বিএনপির জন্য যেমন কঠিন, তেমনি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি এক বড় পরীক্ষা। শান্তিতে ঘুমান আপনি, আপনার সেই চেনা ভঙ্গিমার ভাষণ আর স্মিত হাসি হয়তো আর দেখা যাবে না ঠিকই, তবে মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায় আপনি থাকবেন চিরদিন।
লেখক : মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

