khagrachari Plus
খাগড়াছড়িবুধবার , ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
Khagrachari plus ads
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাহাড়ি আঙিনায় হৃদয়ের মিতালি: হোম-স্টে পর্যটন ও আমাদের আগামীর পথনকশা

মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ ২৯৫ জন পড়েছেন
Link Copied!

পাহাড়ের গায়ে যখন কুয়াশার চাদর নামে, আর সেই কুয়াশা যখন মাচাং ঘরের খুঁটি ছুঁয়ে আলতো করে আপনার জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন যে অনুভূতিটা হয়, সেটা কোনো কাঁচঘেরা এসি হোটেলের জানলা দিয়ে কোনোদিন পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল উঁচুনিচু পাহাড় আর ঝরনার সমাহার নয়, এটা একটা বিশাল যাদুঘর, যার প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে হাজার বছরের সংস্কৃতি। আমরা যখন নেপালের উদাহরণ দিই, তখন আমরা আসলে একটা সফল জীবনের গল্প বলি। নেপালের সেই ছোট ছোট গ্রামগুলোতে যখন আপনি কোনো স্থানীয় মানুষের ঘরে অতিথি হন, তখন তারা আপনাকে কেবল একটা শোবার ঘর দেয় না, বরং তাদের জীবনের একটা অংশ শেয়ার করে নেয়। এই যেহোমস্টেবা মানুষের ঘরে থাকার যে ধারণা, এটা আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন করা কেবল একটি বাণিজ্যিক চিন্তা নয়, এটা একটা আত্মার সেতুবন্ধন। আমি যখন বান্দরবানের নীলগিরি কিংবা খাগড়াছড়ির আলুটিলা নিয়ে ভাবি, আমার বারবার মনে হয়, আমরা পর্যটনের নামে পাহাড়কে কেবল কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়ে ফেলছি। অথচ এই পাহাড়ের আসল আত্মা হলো তার মানুষগুলো। এই মানুষগুলোর সাথে পর্যটকদের সুসম্পর্ক গড়ে তোলা কতটা জরুরি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পর্যটন যখন কেবল ব্যবসা হয়ে যায়, তখন মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ে; কিন্তু পর্যটন যখন বন্ধুত্ব হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই পাহাড়ের প্রতিটি পাথরে প্রাণের স্পন্দন অনুভূত হয়।

পাহাড়ে গিয়ে আমরা অনেক সময় ভুলটা করে বসি এই জায়গায় যে, আমরা সেখানে যাইরাজাহতে, ‘অতিথিহতে নয়। আমরা মনে করি টাকা দিয়েছি মানেই পাহাড়ের সব নিয়ম বদলে দেব। কিন্তু হোমস্টে ধারণার সার্থকতা হলো নিজেকে সেই সংস্কৃতির কাছে সঁপে দেওয়া। পর্যটকদের সাথে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর সম্পর্কটা যদি কেবল লেনদেনের না হয়ে শ্রদ্ধার হয়, তবেই এই শিল্প টেকসই হবে। আমাদের পাহাড়ি ভাইবোনরা সহজাতভাবেই লাজুক কিন্তু অসম্ভব অতিথি পরায়ণ। তাদের সাথে যখন একজন সমতলের পর্যটক বসে রাতের বেলা পিং বা নাপ্পির স্বাদ নেয়, কিংবা তাদের কাছে পাহাড়ের লোকগাঁথা শোনে, তখন যে বিশ্বাসের জন্ম হয়, তা যে কোনো বড় চুক্তিপত্রের চেয়েও শক্তিশালী। এই সম্পর্কটা গড়ে তোলা কেন এত জরুরি? কারণ পর্যটন যখন স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় হস্তক্ষেপ না করে বরং তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, তখনই তারা পর্যটনকে আপন করে নেয়। নেপালে দেখেছি, একজন বিদেশি পর্যটক যখন কোনো পাহাড়ি বৃদ্ধার কাছে পাহাড়ি ভাষায়নমস্তেবলে, সেই বৃদ্ধার চোখে যে ঝিলিক দেখা যায়, সেটাই হলো পর্যটনের আসল বিজ্ঞাপন। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও সেই মায়াটা তৈরি করতে হবে। পর্যটকরা যেন সেখানে গিয়ে নিজেদের কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী মনে না করেন, আর স্থানীয়রা যেন পর্যটকদের তাদের শান্তি নষ্ট করার কোনো আতঙ্ক হিসেবে না দেখেন।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সম্পর্কের সেতুবন্ধন আমরা কীভাবে তৈরি করব? নিয়ে আমার মাথায় একটা স্পষ্ট নকশা আছে, যা অনেকটা স্বপ্নের মতো হলেও বাস্তবে রূপান্তর করা খুব একটা কঠিন নয়। এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলোসাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা আমাদের পর্যটকদের জন্য একটা অলিখিত নিয়ম বা কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তাদের জানানো উচিত যে, আপনি এমন এক জায়গায় যাচ্ছেন যেখানে মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস আর গোপনীয়তা আছে। আপনি তাদের অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না, তাদের উৎসবকে উপহাস করবেন না। এই শিক্ষাটা যখন আমরা পর্যটকদের দিতে পারব, তখন স্থানীয়দের সাথে তাদের প্রথম দেখাতেই একটা সম্মানের দেয়াল তৈরি হবে, যা আদতে দুই পক্ষকেই কাছে আনবে। এরপরের পরিকল্পনাটি হতে পারেকমিউনিটি লিড ট্যুরিজম পাহাড়ি প্রতিটি গ্রামকে এক একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ পর্যটন ইউনিটে রূপান্তর করা যেতে পারে। যেখানে গ্রামের মুরুব্বি বা কারবারিরা ঠিক করবেন তাদের গ্রামে কয়জন পর্যটক থাকবে এবং তারা কীভাবে থাকবে। এতে করে গ্রামের মানুষের ওপর পর্যটনের নেতিবাচক চাপ পড়বে না, বরং তারা পর্যটকদের পরম মমতায় আগলে রাখবে।

এই সেতুবন্ধনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলোস্কিল শেয়ারিংবা দক্ষতা বিনিময়। পাহাড়ি তরুণদের আমরা কেবল গাইড হিসেবে না দেখেসাংস্কৃতিক রাষ্ট্রদূতহিসেবে গড়ে তুলতে পারি। তারা যখন পর্যটকদের পাহাড়ের গল্প শোনাবে, তাদের নিজস্ব গান বা বাঁশির সুর শোনাবে, তখন পর্যটকরা কেবল দৃশ্য দেখে ফিরবে না, বরং একটা হৃদস্পন্দন নিয়ে ফিরবে। অন্যদিকে, পর্যটকরাও যদি তাদের ছোটখাটো কোনো জ্ঞান বা নতুন কোনো ধারণা স্থানীয়দের সাথে শেয়ার করে, তবে এক চমৎকার আদানপ্রদান ঘটবে। আমাদের পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত যেখানে গ্রামের মহিলারা তাদের তাঁতের কাজ সরাসরি পর্যটকদের দেখাতে পারবেন। পর্যটক যখন দেখবে তার জন্য একটা পিনন বা হাদি বোনা হচ্ছে, তখন সেই কাপড়ের দাম সে হাসিমুখে দেবে। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমবে এবং পাহাড়ের ঘরে সরাসরি অর্থ পৌঁছাবে। যখন একজন জুমচাষী দেখবে যে তার কষ্টার্জিত ফসল শহরের মানুষ পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আসবে। এই যে ছোট ছোট মুহূর্ত, এগুলোই হলো পর্যটনের বড় চালিকাশক্তি।

সেতুবন্ধন তৈরিতে খাবারের ভূমিকা নিয়ে যত কম বলি ততই যেন বেশি। আমাদের পরিকল্পনায় প্রতিটি হোমস্টে ইউনিটে একটা নির্দিষ্টকিচেন কালচারথাকতে হবে। পাহাড়ি মাচার ওপর বসে বাঁশ কোড়ল আর বিন্নি চালের ভাত খাওয়ার যে অভিজ্ঞতা, তাকে যদি আমরা একটা ব্রান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে পারি, তবে সেটা হবে এক অভাবনীয় বিষয়। তবে এখানে পর্যটকদেরও সহনশীল হতে হবে। তারা যেন পাহাড়ে গিয়ে ফাস্টফুড বা বিরিয়ানি না খোঁজেন। স্থানীয় স্বাদের সাথে যখন একজন মানুষ নিজেকে মানিয়ে নেয়, তখন সে আসলে ওই পরিবারেরই একজন হয়ে ওঠে। আর স্থানীয় মানুষ যখন দেখে যে বাইরের কেউ তাদের খাবারকে সম্মান দিচ্ছে, তখন তাদের মনের সবটুকু আড়ষ্টতা কেটে যায়। এই যে আস্থার সেতুবন্ধন, এটাই হলো হোমস্টে পর্যটনের মূল চাবিকাঠি। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ি মানুষগুলো প্রকৃতির খুব কাছের, তারা শান্ত থাকতে ভালোবাসে। তাই আমাদের পর্যটন পরিকল্পনায় যেন কোলাহল আর ডিজে পার্টির কোনো জায়গা না থাকে। পাহাড়ের নীরবতাই হোক পর্যটকদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পরিকল্পনার আরেকটা বড় অংশ হওয়া উচিতডিজিটাল কানেক্টিভিটিকিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রিতভাবে। প্রতিটি হোমস্টে জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকতে পারে যেখানে সরাসরি বুকিং দেওয়া যাবে। এতে করে কোনো তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়াই পর্যটক আর হোস্টের মধ্যে যোগাযোগ হবে। নেপালে এই সিস্টেমটা খুব ভালো কাজ করে। বুকিং দেওয়ার সময় থেকেই যখন হোস্ট আর গেস্টের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়, তখন পৌঁছানোর আগেই এক ধরনের চেনা অনুভূতি কাজ করে। পাহাড়ে পৌঁছালে যখন স্বয়ং হোস্ট এসে পর্যটককে স্বাগত জানায়, তখন সেই পর্যটক নিজেকে আর বিদেশি বা অচেনা ভাবে না। এই ব্যক্তিগত ছোঁয়াটাই হলো বড় রিসোর্ট আর হোমস্টের মধ্যে পার্থক্য। রিসোর্টে আপনি কেবল একজন কাস্টমার বা খদ্দের, কিন্তু হোমস্টেতে আপনি একজন মেহমান। এই অনুভূতির কোনো দাম হয় না। বাংলাদেশিদের তো আতিথেয়তার সুনাম পৃথিবী জুড়ে, আমরা যদি পাহাড়ের এই সরলতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তবে আমাদের পাহাড় হবে শান্তির এক অনন্য নীড়।

এর পাশাপাশি আমাদের একটাট্রাস্টি ফান্ডবা কল্যাণ তহবিল গঠন করতে হবে। প্রতিটি পর্যটক যখন কোনো পাহাড়ি গ্রামে থাকবেন, তাদের খরচের একটা নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র অংশ সেই গ্রামের শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য জমা হবে। যখন গ্রামবাসী দেখবে যে পর্যটকদের আসার কারণে তাদের গ্রামের স্কুলের সংস্কার হচ্ছে কিংবা তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন তারা পর্যটকদের নিজেদের আপনজন ভাবতে শুরু করবে। পর্যটন তখন আর কেবল বাইরের মানুষের বিনোদন থাকবে না, তা হয়ে উঠবে পাহাড়ের মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। এই যে একাত্মতা, এটাই হলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আসল উদ্দেশ্য। আমরা যখন নেপালের কথা বলি, তখন দেখি সেখানে পর্যটকরা মাসের পর মাস পাহাড়ে থাকে। কেন থাকে? কারণ তারা সেখানে ঘর খুঁজে পায়। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামকেও এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন একজন পর্যটক সেখানে গিয়ে ফিরে আসার জন্য ছটফট না করে, বরং আরও কয়েকটা দিন বেশি থাকার পরিকল্পনা করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র করতে হলে আমাদের পরিবেশ রক্ষার শপথ নিতে হবে। পর্যটক আর স্থানীয়দের সাথে মিলেগ্রিন মাউন্টেনবা সবুজ পাহাড় আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। তারা একসাথে বসে ঠিক করবে কীভাবে পাহাড়কে প্লাস্টিকমুক্ত রাখা যায়। পর্যটকরা যখন দেখবে স্থানীয় মানুষরা প্রকৃতিকে মায়ের মতো সম্মান করছে, তখন তারাও প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে দ্বিধাবোধ করবে। এই যে যৌথ অংশগ্রহণ, এটা পর্যটকদের মনে এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তারা কেবল দর্শক হিসেবে নয়, পাহাড়ের রক্ষক হিসেবেও নিজেদের ভাবতে শুরু করে। নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে যাওয়ার পথে আমি দেখেছি পর্যটকরা কীভাবে নিজেদের আবর্জনা নিজেরা বয়ে নিয়ে আসে। এই সংস্কৃতিটা আমাদের এখানেও চালু করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করার এই যে আনন্দ, তা পর্যটকদের জন্য এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।

পরিকল্পনার শেষ ধাপে থাকবে আন্তর্জাতিক প্রচার। আমরা যখন বলব যে বাংলাদেশের পাহাড় কেবল দেখার জায়গা নয়, এটা মানুষের সাথে মানুষের ভালোবাসার জায়গা, তখন বিশ্ববাসী অবাক হবে। আমরা যদি আমাদের পাহাড়ি জেলাগুলোর প্রতিটি গ্রামকে তাদের বিশেষত্বের ভিত্তিতে পরিচিত করতে পারিকোনো গ্রাম হয়তো কেবল তাঁতের জন্য বিখ্যাত, কোনো গ্রাম হয়তো তাদের বিশেষ বাঁশির সুরের জন্যতবে পর্যটকরা তাদের রুচি অনুযায়ী ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারবে। নেপালের সোলুখুম্বু বা মুস্তাং জেলা যেমন পর্যটকদের কাছে বিশেষ পরিচিত, আমাদের রুমা বা থানচিকেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। আর এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় সারথি হবে আমাদের পাহাড়ি মানুষগুলো। তাদের অবজ্ঞা করে বা তাদের দূরে সরিয়ে রেখে কোনো পর্যটনই সফল হবে না। তাদের হাতে হাত রেখেই আমাদের এগোতে হবে।

যখন আমরা প্রকৃতির কাছে যাই আর মানুষের শুদ্ধ রূপ দেখি, তখন আমাদের ভেতরের সব কালিমা দূর হয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা আর প্রতিটি মানুষের হাসি আমাদের সেই শুদ্ধতা দিতে পারে। হোমস্টে পর্যটন আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়। পাহাড়ের বুক চিরে নয়, পাহাড়ের কোলে চড়ে আমাদের এই পথ চলা হোক শান্তির আর সৌহার্দ্যের।

লেখক : মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমনঅর্থনীতি বিশ্লেষককলামিস্ট  সদস্যখাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

Khagrachari plus ads